thereport24.com
ঢাকা, সোমবার, ২৮ মে ২০১৮, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫
মাহমুদুল হাসান

দ্য রিপোর্ট

১৩ ভুলের শিকার খালেদা

২০১৬ মে ২৯ ২২:৩৯:২৬
১৩ ভুলের শিকার খালেদা

গৃহবধূ থেকে দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। উপমহাদেশের রাজনীতিতে এমন নজিরের অভাব নেই। ভারত-পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কা বা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এমন বেশ কয়েকজন গৃহবধূর খোঁজ মেলে, যারা দোর্দণ্ড প্রতাপে দেশ চালিয়েছেন। তাদেরই একজন বেগম খালেদা জিয়া, যার স্বামী ছিলেন একজন সেনানায়ক ও রাষ্ট্রপতি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির প্রতিষ্ঠাতাও ছিলেন জিয়াউর রহমান।

১৯৮১ সালের ৩০ মে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউর রহমান এক রক্তাক্ত সেনা অভ্যুত্থানে নিহত হওয়ার পর তার স্ত্রী খালেদা জিয়া দলের হাল ধরেন। গৃহবধূ থেকে হয়ে ওঠেন একজন পাক্কা রাজনীতিবিদ।

১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি জিয়াউর রহমানের গড়া বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ নেন খালেদা জিয়া। পরে দলের প্রধান হিসেবে তখনকার স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে কাটিয়ে দেন ৯ বছর। স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতনের পর সাধারণ নির্বাচনে চমকপ্রদ বিজয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের ‘প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে ইতিহাস গড়েন তিনি।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ‘আপসহীন নেত্রী’র খেতাব পাওয়া খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে যেমন রয়েছে অনেক সফলতার গল্প, তেমনি গত কয়েক বছরে আওয়ামী নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারবিরোধী আন্দোলনে রয়েছে অনেক ব্যর্থতার নজির। এমনকি রাজনীতির মাঠে অনেক ‘ভুল’ও করতে দেখা গেছে তাকে।

রাজনীতির ময়দানে খালেদা জিয়ার সেসব ভুলের ব্যবচ্ছেদ করেছে দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকম।

অতীতে সফল রাজনৈতিক হিসেবে পরিচিতি পেলেও বিগত কয়েক বছর ধরে রাজনীতিতে ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে। রাজনীতিতে কখনো নিজেই ‘ভুল’ করেছেন, কখনো বা ভুলের শিকার হয়েছেন বিএনপি-প্রধান। তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থেকে ‘আপসহীন’ নেত্রী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ‘সফল’ ব্যক্তি হওয়ায় অনুসারীরা তাকে ‘দেশনেত্রী’ হিসেবে অভিহিত করে থাকেন। কিন্তু ১/১১-এর পর থেকে তিনি ও তার দল আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি। প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে বড় সংকটকাল অতিক্রম করছে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের গড়া দলটি।

অনুসারীদের চোখে খালেদা জিয়ার ভুল

সেনাসমর্থিত মঈন-ফখরুদ্দিনের দেওয়া নির্বাচন থেকে সব শেষ হরতাল-অবরোধে খালেদা জিয়ার অনেক সিদ্ধান্তে বেশ নাখোশ দলের অনেক নেতা-কর্মী। তারা বেশ কয়েকটি ভুলকে বিএনপির ব্যাকফুটে চলে যাওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন। যদিও এসব নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে কেউই রাজি নন।

জামায়াতকে বিএনপির সঙ্গে নেওয়া

২০০১ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে সঙ্গে নেওয়াটাকে দলের একাধিক নেতা ভুল হিসেবে দেখছেন। যদিও এ বিষয়ে কেউই প্রকাশ্যে মুখ খুলতে নারাজ। বিএনপি সরকার গঠন করলে স্বাধীনতাবিরোধী সংগঠন জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে মন্ত্রী বানানো হয়। এটা দেশের মানুষ ভালো চেখে দেখেনি।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের সভা সমাবেশ কর্মসূচিতে জামায়াত-শিবির নেতাদের সামনের সারিতে অবস্থান, সমাবেশস্থলে বসা, ব্যানার নিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের মুক্তির দাবি তোলা নিয়ে বিএনপির অনেক নেতাকেই বিব্রত হতে দেখা যায়।

এ ছাড়া ‘ছাত্রদল-ছাত্র শিবির একই বৃন্তে ফোটা দুটি ফুল’ দলের সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এমন বক্তব্যও ভালোভাবে নেননি দলের নেতা-কর্মীরা।

বি. চৌধুরীর অপসারণ

বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব ও সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে অপসারণসহ দল থেকে বিতাড়িত করার ঘটনা দলের অনেক নেতাই ভালো চোখে দেখেননি।

২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর বি. চৌধুরীকে বিএনপি রাষ্ট্রপতি মনোনীত করে। এর কয়েক মাস পর ২০০২ সালের ২৯ মে, জিয়াউর রহমানের ২১তম শাহাদাৎ দিবসের এক দিন আগে রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী একটি বিবৃতি দেন। যাতে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। রাষ্ট্রপতি একজন নিরপেক্ষ ব্যক্তি, তাই তিনি জিয়ার মাজারে ফুল দিতে যাননি। এতেই ক্ষেপে যান দলের সব এমপি। একপর্যায়ে ২০০২ সালের ১৯ ও ২০ জুন বিএনপির সংসদীয় দলের সভায় রাষ্ট্রপতি পদ থেকে তাকে সরানোর জন্য ‘ইমপিচমেন্ট’ প্রস্তাব গৃহীত হয়। ওই প্রস্তাব সংসদে উত্থাপনের আগেই ২১ জুন রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন বি. চৌধুরী।

রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়ার পর বি. চৌধুরী বিএনপি থেকেও পদত্যাগ করেন। ২০০৪ সালে বি. চৌধুরী বিকল্প ধারা বাংলাদেশ নামে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন। বর্তমানে তিনি দলটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

‘বাংলাদেশে গণতন্ত্র’ বইয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ লিখেছেন, ‘রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাৎ দিবসটি বিএনপি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন করে। ২০০২ সালের ২৯ মে, ২১তম শাহাদাৎ দিবসের এক দিন আগে রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী একটি বিবৃতি দেন। যাতে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি...।’

মওদুদ আহমদ বইয়ের আরেকটি জায়গায় লিখেছেন, ‘যেহেতু যখনই খালেদা জিয়া ভাবলেন যে তার স্বামীকে অবমাননা করা হয়েছে এবং বেগম জিয়ার ধারণা জন্মেছিল যে বদরুদ্দোজা চৌধুরীর আচরণ ছিল অনানুগত্য ও বিশ্বাসঘাতকতার শামিল; তখন দলের সকলেই বুঝতে পেরেছিলাম যে বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নিষ্ক্রান্ত হওয়া ছিল অবধারিত। ব্যক্তিত্বের সংঘাত এড়াতে বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে অপসারণ করে আরও অনুগত, নমনীয় ও বিশ্বাসী কাউকে সেখানে বসানো ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।’

বইটির ৪১৯ পৃষ্ঠার দ্বিতীয় প্যারায় ব্যারিস্টার মওদুদ বলেন, ‘বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে জোর করে বের করে দেওয়ার পর তিনি সরকারবিরোধী হিসেবে রাজনীতিতে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিলে বিএনপি সরকার তা স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়নি। গণতন্ত্রের বাহক দলীয় নেতারা তাকে রাশ টেনে ধরার প্রয়াস পান।’

এ ছাড়া রাষ্ট্র জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থেকে জাতীয়তাবাদী দলের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। ১৯৮৪ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত তিনি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে আসন বণ্টন নিয়ে দলের সঙ্গে মতভেদ সৃষ্টি হলে তিনি বিএনপি থেকে সরে দাঁড়ান। পরে তিনি এলডিপি (লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি) গঠন করেন। অলিকে দলে ধরে না রাখতে পারাও খালেদার রাজনীতির অন্যতম ব্যর্থতা বলে মনে করেন কোনো কোনো নেতা। অলির এলডিপি বর্তমানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক।

২০০৮-এর নির্বাচনে যাওয়া

খালেদা জিয়া নিজেও ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে যাওয়াটাকে ভুল বলে অভিহিত করেন।

ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিনের তত্ত্বাবধানে ২০০৮ সালে ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। বিএনপির ব্যাপক ভরাডুবি হয়।

প্রণব মুখার্জির সঙ্গে দেখা না করা

বিএনপির একাধিক নেতা বলেন, কংগ্রেস জমানায় খালেদা জিয়ার ভারত সফরের পর দেশটি তার বাংলাদেশ নীতিতে পরিবর্তন এনেছিল। ভারত সফরে খালেদা জিয়াকে লালগালিচা সংবর্ধনা দেওয়া হয়। অথচ ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ সফরের সময় তার সঙ্গে খালেদা জিয়া সাক্ষাৎ করেননি। আজকে সেই ভুলের খেসারত দিচ্ছে হচ্ছে। হরতাল প্রত্যাহার করে ওই দিন প্রণব মুখার্জির সঙ্গে দেখা করা উচিত ছিল।

ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর সাথে সাক্ষাৎ না করার বিষয়ে ভারতের দ্য সানডে গার্ডিয়ানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেন, হুমকির কারণেই ২০১৩ সালে ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির সঙ্গে সাক্ষাৎ বাতিল করেছিলাম। কারণ আমার প্রাণনাশের হুমকি ছিল। যদি আমার কিছু হতো (বৈঠকে যাওয়ার পথে), আমাদের বিরোধীরা এজন্য জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করার পরিকল্পনা করেছিল। গত বছর ১৩ জুন সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়।

গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে না যাওয়া

বিএনপির অনেক নেতার মতে, প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে সাড়া না দেওয়াটা ছিল খালেদা জিয়ার আরেকটা রাজনৈতিক ভুল। কারণ, ম্যাডামই সংলাপের আহ্বান জানিয়েছিলেন। ঠিক আছে, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আহ্বানে সাড়া দেননি প্রধানমন্ত্রী। তাতে কী হয়েছে? ফোন তো করেছিলেন। ওই আমন্ত্রণে গেলেই সব হয়ে যেত এমনটা নয়। ওখানে রাজনৈতিক পরাজয় হয়েছে।

২০১৩ সালে ২৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টেলিফোন করেন তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে। ওই দিন টেলিফোন সংলাপে তিনি খালেদা জিয়াকে ২৮ অক্টোবর সোমবার সন্ধ্যা ৭টায় গণভবনে নৈশভোজের আমন্ত্রণ জানান শেখ হাসিনা। পাশাপাশি তিন দিনের হরতাল প্রত্যাহার করতে বিএনপি চেয়ারপারসনের প্রতি আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।

হেফাজতের কর্মসূচিতে বিএনপিরঅস্পষ্টভূমিকা

২০১৩ সালে ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের ঢাকা সমাবেশকালে বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট করতে না পারায় বহির্বিশ্বের কাছে ভুল বার্তা গেছে বলে মনে করেন দলের নেতারা।

মার্চ ফর ডেমোক্রেসি

নেতারা বলেন, যখন তৃণমূলে আন্দোলন তুঙ্গে তখন ২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি’ কর্মসূচি পালন করতে সবাইকে ঢাকায় ডাকা হলো। এর ফল কী পাওয়া গেল? জিরো। এরপর ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর আন্দোলন থেকে সরে আসা ঠিক হয়নি। আন্দোলন অব্যাহত থাকলে সরকার আরেকটি নির্বাচন দিতে বাধ্য হতো।

নেতারা আরও বলেন, ‘‘৫ জানুয়ারি ‘একতরফা’ নির্বাচনে কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে গত বছর (২০১৫) অবরোধ কর্মসূচিতে যাওয়া ঠিক হয়নি। কোনো ধরনের প্রস্তুতি ছাড়াই এ ধরনের কর্মসূচিতে যাওয়া ছিল আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এর আগে ২০১৩ সালে ঢাকায় হেফাজতে ইসলামের অবস্থান কর্মসূচিতে সমর্থন দেওয়াও ঠিক হয়নি। এতে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোর কাছে ভুল বার্তা গেছে।’’

২০১৪ সালের ভোট বর্জন

বিএনপি নেত্রীর ভুল নিয়ে নিজেদের মধ্যে মাঝারি সারির নেতারা সরব হলেও প্রকাশ্যে মুখ খুলতে কেউই রাজি নন। দলের প্রধানকে নাখোশ করতে চান না, মধ্যম সারির এমনই এক নেতা দ্য রিপোর্টের কাছে দলীয় প্রধানের ভুল নিয়ে কথা বলেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন বয়কট করার সিদ্ধান্ত ছিল মারাত্মক ভুল।’

এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘সেই প্রেক্ষাপট আর বর্তমান প্রেক্ষাপট এক নয়। ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে অংশ নিয়ে ১০০ আসন পেলেও আমরা বিরোধী দলে থাকতে পারতাম। ওখান থেকে আন্দোলন চালিয়ে নেওয়া যেত। এখন আমরা সংসদেও নাই, রাজপথেও নাই।’

দলের অনেক নেতা মনে করেন, ওয়ান-ইলেভেন বিএনপির সবকিছু এলোমেলো করে দেয়। সেই ধাক্কা বিএনপি এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি। তা ছাড়া, খালেদা জিয়ার কাছের লোকদেরও দলের ক্ষতির জন্য দুষছেন এসব নেতা।

হঠাৎ আন্দোলন বন্ধ

নেতাদের অভিযোগ, ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের পর হঠাৎ করেই আন্দোলন বন্ধ করে দেওয়া হলো। এটা কেন করা হলো, কার কথায় আন্দোলন বন্ধ হলো। ওই আন্দোলন চলতে থাকলে আওয়ামী লীগ শর্ত অনুযায়ী ফের নির্বাচন দিতে বাধ্য হতো।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের মধ্যম সারির এক নেতা দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘কোনো বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা যাবে না। যা হচ্ছে সব সঠিক বলে যেতে হবে।’

অপর এক নেতা মনে করেন, খালেদা জিয়াকে ভুল বুঝিয়ে ২০০৮ সালের নির্বাচনে নেওয়া হয়। যে ভুলের খেসারত এখনো দিতে হচ্ছে। জামায়াতকে সঙ্গে নেওয়াই ছিল সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভুল। এর ফল এখনো ভোগ করতে হচ্ছে। দলের বড় একটা অংশ জামায়াতকে নিয়ে রাজনীতি করতে চান না।

প্রস্তুতি ছাড়াই কর্মসূচি ঘোষণা

২০১৫ সালের ৩ জানুয়ারি দলীয় চেয়ারপারসন গুলশান কার্যালয়ে অবরুদ্ধ হওয়ার পর কোনো ধরনের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা ছাড়াই অনির্দিষ্টকালের জন্য সড়ক, রেল ও নৌপথ অবরোধের মতো কর্মসূচি দেওয়া হয়।

প্রধানমন্ত্রী আসবেন খালেদা জানতেন না

২০১৫ সালে ২৫ জানুয়ারি ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুতে সমবেদনা জানাতে খালেদা জিয়া কার্যালয়ের গেট থেকে ফিরে যান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কার্যালয়ের গেট ছিল তালাবদ্ধ। ওই দিন খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ের সামনে থেকে ফিরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ওই কার্যালয়েই ছিলেন দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরামের সদস্যসহ আরও অনেকেই। কিন্তু সঠিক সময় কেউ এগিয়ে আসেননি।

গুলশান কার্যালয় ‘বলয়’

খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়কেন্দ্রিক একটি ‘বলয়’ আছে। যে কারণে চাইলেই চেয়ারপারসনের সঙ্গে সাধারণ নেতা-কর্মীরা সাক্ষাৎ করতে পারেন না- দলের বড় একটি অংশের নেতাকর্মীদের এমন অভিযোগ আছে।

তাদের দাবি, গুলশান কার্যালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী বেষ্টিত। ওখানে রাজনীতিকদের কোনো জায়গা নেই। গুলশান অফিস থেকে তথ্য ফাঁস হওয়া বা খালেদা জিয়ার রুম থেকে কথা রেকর্ড করার যন্ত্র উদ্ধার হওয়ার ঘটনা তো সবারই জানা আছে। দলের এক সিনিয়র নেতা দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) ডাকলে গুলশান অফিসে যাই, নইলে খুব একটা যাওয়া পড়ে না।’

চীনও নাখোশ!

২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে চীনের বৈরী রাষ্ট্র তাইওয়ানের সঙ্গে সখ্য গড়াও খালেদার বিদেশ নীতিতে চিড় ধরিয়েছিল। তাইওয়ানের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ার চেষ্টায় বিএনপির এক সময়ের বন্ধু চীন বেশ নাখোশ হয় বলেও বিএনপির কয়েকজন নেতা জানান।

শীর্ষ নেতাদের ভিন্নমত

আন্দোলন-সংগ্রামে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দলের নেতা-কর্মীরা এমন ভুল খুঁজে পেলেও শীর্ষ নেতাদের কয়েকজন তা মানতে নারাজ।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচনে যাব না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন না যাওয়া নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। হয়তো একদিন ইতিহাস বলবে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনের মতোই ওই নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেওয়া সঠিক ছিল। খালেদা জিয়া যে কথা বলেন, ওই কথা অনুযায়ী চলেন বলেই তিনি আপসহীন নেত্রী।’

নজরুল ইসলাম খান আরও বলেন, ‘দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না। উপজেলা, পৌর নির্বাচন ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে এটা প্রমাণ হয়েছে।’

জানতে চাইলে দলের আরেক স্থায়ী কমিটি সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘যেখানে সমস্ত মিডিয়া সরকারের নিয়ন্ত্রণে, তারা তো বলবেই বিএনপি শেষ হয়ে গেছে। বাস্তবে সবাই জানে বিএনপির অবস্থা আরও ভালো হয়েছে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘আমাদের দল মনে করেছে, শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে গেলে কোনো লাভ হবে না। লোকাল নির্বাচনে তা প্রমাণ হয়েছে। কোনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না।’

দলের ভাইস-চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান দ্য রিপোর্টকে বলেন, ‘পৃথিবীর প্রায় দেশেই দলগত সুবিধার স্বার্থে জোট হয়। জামায়াতের সঙ্গে আমাদের জোট আছে। এটা রাজনৈতিক জোট, আদর্শিক না।’

জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আলোচনা-সমালোচনা হতে পারে। ভুল কি ঠিক এগুলো নিয়েও কথা হয়। আসলে আমরা তো আমাদের রাজনীতি করছি, জামায়াত তাদের রাজনীতি করছে।’

গৃহবধূ থেকে প্রধানমন্ত্রী

১৯৮২ সালে ৩ জানুয়ারি খালেদা জিয়া দলে প্রাথমিক সদস্যপদ নিয়ে গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে আসেন। ১৯৮৩ সালে সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান, ১৯৮৪ সালে ১২ জানুয়ারি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও একই বছরে ১ মে চেয়ারপাসনের দায়িত্ব পান। এরপর থেকে ‘স্বৈরাচারের সঙ্গে কোনো আপস নয়’ এই নীতিতে অটুট থেকে নয় বছর এরশাদবিরোধী আন্দোলন চালিয়ে যান। এরশাদের অধীনে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে যাননি তিনি। ওই নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় খালেদা জিয়া ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিতি পান। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। দেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ‘একতরফা’ নির্বাচন করে বিএনপি আবারও ক্ষমতায় আসে। বেশি দিন টিকতে পারেননি তারা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হয়। পরের নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। এরপর ২০০১ সালের আবারও ক্ষমতায় আসে বিএনপি। ২০০৬ সালে ২৮ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দলটি। ২০০৭ সালে ২২ জানুয়ারির নির্বাচন আওয়ামী লীগ বয়কট করলে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। দেশজুড়ে শুরু হয় তুমুল আন্দোলন। এর প্রভাবে ফখরুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন ১১/১ সরকার আর্বিভাব ঘটে। দুর্নীতির দায়ে সপরিবারে খালেদা জিয়াকে জেলে যেতে হয়। পরবর্তীতে জামিনে মুক্তি পান তারা। দুই ছেলেকে বিদেশে চলে যেতে হয়। বড় ছেলে তারেক রহমান এখনো দেশে ফিরতে পারেননি। আরেক ছেলে আরাফাত রহমান কোকো বিদেশের মাটিতেই মারা গেছেন।

সেই সরকারের দেওয়া নির্বাচনে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে সরকার গঠন করে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে আবারও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। ওই নির্বাচন বিএনপির বর্জন করে বিরোধী দলে থেকে ছিটকে পড়ে।

স্বজন হারানো

১১/১-এর পর থেকে স্বজন হারানোর বিপর্যয়ে পড়েছেন খালেদা জিয়া। মৃত্যুর মিছিলে একে একে যুক্ত হয়েছেন তার মা, ভাই ও সন্তানসহ চারজন।

১/১১-এর সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় ২০০৮ সালের ১৮ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার মা তৈয়বা মজুমদার মারা যান। ওই সময় খালেদা জিয়া দুর্নীতি মামলায় কারাগারে ছিলেন। পরদিন প্যারোলে মুক্তি পেয়ে তিনি মায়ের লাশ দেখতে যান।

মায়ের শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর বিকেলে খালেদা জিয়াকে তার ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। এরপর ওই বাড়িটির নিয়ন্ত্রণ নেয় ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড। স্বামীর স্মৃতিবিজড়িত দীর্ঘ ৩৮ বছর বসবাস করা ক্যান্টমেন্টের শহীদ মইনুল রোডের বাড়ি নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়াকে ফুঁপিয়ে কাঁদতে দেখা যায়।

স্বামীর স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি হারানোর ব্যথা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ছোট ভাই সাঈদ ইস্কান্দার মারা যান। ২০১২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সময় রাত সোয়া ১০টায় নিউইয়র্কের ব্রুকডেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি।

এ ছাড়া গত বছর ২৭ ডিসেম্বর মারা যান খালেদা জিয়ার স্বামী জিয়াউর রহমানের চাচাতো ভাই ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মহিতুর রহমান চৌধুরী।

সর্বশেষ ২৪ জানুযারি দুপুরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মালয়েশিয়ায় মারা যান ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো।

(দ্য রিপোর্ট/এমএইচ/এএসটি/এনআই/এম/মে ২৯, ২০১৬)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert
Symphony

বিশেষ সংবাদ এর সর্বশেষ খবর

বিশেষ সংবাদ - এর সব খবর



রে