thereport24.com
ঢাকা, সোমবার, ২৮ মে ২০১৮, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫

সিনেমা যখন বাস্তব

বজরঙ্গি ভাইজানকে হার মানালেন বরগুনার ভাইজান জামাল

২০১৬ মে ৩১ ২০:৫৮:১৮
বজরঙ্গি ভাইজানকে হার মানালেন বরগুনার ভাইজান জামাল

সিনেমার গল্প যেন হার মেনে যাচ্ছে বরগুনার জামাল ইবনে মূসার কাছে। তার প্রচেষ্টায় হাজার মাইলের দূরত্ব আর সীমানা প্রাচীরের বাধা পেরিয়ে প্রিয় সন্তান অভিরূপ সনুকে ফিরে পেতে যাচ্ছেন দিল্লির মেহবুব-মাধুরী দম্পতি। মামলা, হয়রানি, জেল ভোগান্তির মাধ্যমে মানবিক দৃষ্টান্তের এক অসাধারণ নজির স্থাপন করে সিনেমার ‘বজরঙ্গি ভাইজান’-কে হার মানিয়ে দিতে যাচ্ছেন বাস্তবের নায়ক ‘বরগুনার ভাইজান’ জামাল ইবনে মূসা।

বরগুনার ভাইজানের প্রচেষ্টায় দীর্ঘ ৬ বছর পর বাবা-মায়ের কোলে ফিরতে যাচ্ছে সনু। যে (সনু) ৬ বছর বয়সে পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে ২০১০ সালের মে মাসে ভারত থেকে বাংলাদেশে চলে আসে। বর্তমানে যশোর কিশোর সংশোধনী কেন্দ্রে থাকা সনুর ভারত ফেরা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। সনুকে দেশে ফেরত পাঠানোর জন্য ভারতে গিয়ে তার বাবা-মাকে খুঁজে বের করেছেন জামাল ইবনে মূসা। দেখা করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজের সঙ্গে।

ইতিমধ্যে ভারত সনুকে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশন থেকে দেশটির কর্মকর্তারা যশোর কিশোর সংশোধনী কেন্দ্রে সনুর সঙ্গে দেখা করে এসেছেন। সুষমা স্বরাজ নিজেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে টুইট করে সনুর বিষয়ে তার সরকারের উদ্যোগের বিষয়টি জানিয়েছেন।

ভারতে হারিয়ে যাওয়া একটি শিশুকে পাকিস্তানে তার বাবা-মার কোলে ফিরিয়ে দেওয়ার গল্প নিয়ে ২০১৫ সালে বলিউডে নির্মিত হয় ‘বজরঙ্গি ভাইজান’। সিনেমাটিতে শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী শিশু শাইলাকে পাকিস্তানে বাবা-মার কাছে ফিরিয়ে দিতে বজরঙ্গি ভাইজানের মানবিক আপ্রাণ প্রচেষ্টা জয় করে নেয় দর্শক হৃদয়।

এই সিনেমা হিট হওয়ার পর ভারত থেকে পথ ভুলে পাকিস্তানে যাওয়া গীতা নামের এক শ্রবণ ও বাকপ্রতিবন্ধী মেয়েকে ভারতে ফিরিয়ে নিতে মিডিয়ায় একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছিল। এরপর গীতার ফেরা হয়েছে কি না জানা যায়নি। তবে ‘বরগুনার ভাইজানের’ প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ থেকে সনুর ভারত ফেরা যে এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র, তা বলা যেতেই পারে।

সোমবার (৩০ মে) দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে সনুকে খুঁজে পাওয়া আর তারপরের অজানা চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য জানান জামাল ইবনে মূসা। বর্ণনা করেন কীভাবে হাজার মাইল দূরত্বের নয়াদিল্লির সীমাপুরী ও বাংলাদেশের বরগুনার বেতাগী উপজেলার গ্রামবর্ধন গ্রামকে এক সুতোয় গাঁথলেন।

জামাল-সনুর প্রথম সাক্ষাৎ

বরগুনা জেলার বেতাগী উপজেলার গ্রামবর্ধন গ্রাম। এই গ্রামের বাসিন্দা জামাল ইবনে মূসা। ঢাকায় একটি রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন তিনি। নিজ গ্রামে খুঁজে পান সনুকে। একদিন সনুর পাশ দিয়েই বাড়ি ফিরছিলেন তিনি।

শিশুটিকে দেখে বেশ মায়া হয় তার। ওর সঙ্গে গল্প জুড়ে দেন। জামাল বলেন, ‘ওর নাম, কোন বাড়ির ছেলে, কোথায় পড়ালেখা করে―ইত্যাদি জানতে চাই আমি। ওর কথায় বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। সনু জানায়, তার বাড়ি ভারতের দিল্লিতে। তাকে পাচার করে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়েছে।’

সনুর পাচার কাহিনি

জামালকে সনু জানায়, ‘আমরা তিন ভাই। নন্দু নামে এক বড় ভাই আছে। দিল্লিতে থাকার সময় একদিন রহিমা নামের একজন আমাকে দোকান থেকে পান আনতে বলে। এরপর বলে তুমি আমার সঙ্গে আসো, তোমার ভাইয়ের জন্য দুধ কিনে দিব।’

সনু তাকে আরও জানায়, ‘এই কথা বলে রহিমা আমাকে নিয়ে যায় তার বড় বোন হাসি বেগমের কাছে। হাসি বেগম আমাকে বোঝায় আমার আসল মা রহিমা।’

হাসি বেগম সনুকে নানাভাবে প্রলুব্ধ করে। হাসি সনুকে জানায়, ‘ছোট সময়ে তোকে ওইখানে (সনুর নিজ বাড়ি) লালন পালন করতে দিয়েছিলাম। এখন থেকে তুই আমাদের কাছে থাকবি।’

এসব বলে হাসি বেগম ও রহিমা খুব যত্ন নেওয়া শুরু করে সনুর। তার জন্য ভালো ভালো খাবারের ব্যবস্থা করে। এক সময় সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সনুকে বাংলাদেশের বরগুনা জেলার বেতাগী উপজেলার গ্রামবর্ধন গ্রামে নিয়ে আসেন হাসি বেগম। মানুষের কাছে পরিচয় দেন বোনের সন্তান হিসেবে।

বাংলাদেশে সনুর কষ্টের জীবন

বাংলাদেশে আসার পর ভারতের আদর-যত্নের দিন শেষ হয় সনুর। নেমে আসে অন্ধকার। নিজের বোনের ছেলে বলে পরিচয় দিলেও সনুকে দিয়ে খুব কষ্টের কাজ করাতেন হাসি বেগম। জামাল বিন মূসা নিজের দেখা এবং প্রতিবেশীদের বরাত দিয়ে দ্য রিপোর্টকে জানান, হাসি বেগম ও তার বোনেরা নিজেদের ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পাঠায়, ভালো কাপড় পরায়। কিন্তু সনুকে নোংরা কাপড় পরতে দেয়। ওকে দিয়ে গরু চরানো, গোবর সংগ্রহ করানোর কাজ করায়। এগুলো দেখে গ্রামের অনেকেই সন্দেহ করত সনু হয়তো রহিমার সন্তান নয়।

এই সন্দেহের কারণ জানতে চাইলে জামাল দ্য রিপোর্টকে বলেন, এরা সাত বোনের মধ্যে সবাই পর্যায়ক্রমে ভারতে যাওয়া-আসা করে। অনেক সময় নতুন শিশু এদের সঙ্গে আনতে দেখা যায়। শিশুদের বিষয়ে জানতে চাইলে বলত, এইটা আমার অমুক বোনের সন্তান। দুই দেশ মিলিয়ে বসবাস করে এরা। সাত বোনের সন্তানের হিসাব কারও জানা নেই।

সনুকে দিল্লিতে ফেরানোর পরিকল্পনা

সোমবার রাতে (৩০ মে) দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমের কার্যালয়ে আসেন জামাল বিন মূসা। তিনি দ্য রিপোর্টকে বলেন, সনুর কাহিনি জানার পর ছেলেটার প্রতি মায়া জন্মায়। তাকে বেশ আদর করতাম। এলাকার দোকানে গেলে খাবার কিনে দিতাম। আমি বাড়িতে গেলে কাছে আসত। আমার ভাগ্নেদের মতো আমাকে ‘বড় আব্বা’ বলে ডাকত। ২০১৫ সালের ডিসেম্বরের শেষের দিকে একদিন বরগুনা শহরের বাসস্ট্যান্ডে নেমে সনুকে পেলাম। সেখান থেকেই ওকে দিল্লি পৌঁছানোর পরিকল্পনা মাথায় ঢুকল।

পকেটে ১০ টাকা, দিল্লি বহু দূর

শহরে আসার কারণ জানতে চাইলে সনু জামাল বিন মূসাকে জানায়, সে দিল্লি যাবে। পকেটে আছে দশ টাকা। জামাল শহরে নিজের কাজ সেরে সনুকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসেন। নিজের বাসায় দিন বিশেক রেখে আবার বরগুনা নিয়ে যান। এ সময় তিনি

যোগাযোগ করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্র দেবনাথ সম্ভুর সঙ্গে।

সংসদ সদস্যের স্ত্রী ছেলেটিকে নিজের কাছে রাখার আগ্রহ দেখান। কিন্তু জামালের পরিকল্পনা সনুকে দিল্লিতে বাবা-মায়ের কাছে পাঠাতে হবে।

জামাল বিন মূসার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সনুকে নিয়ে বরগুনা আসার খবর পেয়ে হাসি বেগম তার নামে শিশু অপহরণ মামলা করেন। অন্যদিকে জামাল এর আগের দিন বিকেলে হাসি বেগমদের বিরুদ্ধে মামলা করেন। সনুকে ভারত থেকে অপহরণ করে আনার অভিযোগে এই মামলাটি করেন তিনি। পরের দিন বিষয়টি আদালতে ওঠালে সনুকে যশোরের কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে রাখার আদেশ দেওয়া হয়।

প্রথম পর্যায়ে জামাল বিন মূসার বড় সফলতা এটাই। অন্তত হাসি বেগমদের অধীনে যেতে হয়নি ছেলেটির। এর জন্য বরগুনা আদালতের বিচারক আব্বাস সাহেবকে আবেগাপ্লুত কন্ঠে বার বার শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন জামাল। তবে, এদিনই অপহরণ মামলায় জেলে যেতে হয়েছে জামালকে।

জামালের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা

ছেলেটি হাতছাড়া হওয়ার পর থেকে হাসি বেগম কারণে-অকারণে জামাল বিন মূসার বাড়ির লোকদের মিথ্যে মামলা দিয়ে হয়রানি শুরু করেন।

জামাল বিন মূসা দ্য রিপোর্টকে বলেন, যেহেতু সনুর জন্য তাকে এত কিছু সহ্য করতে হয়েছে, তাই এর শেষ দেখার ব্রত নিয়ে তিনি ভারতে সনুর বাবা-মাকে খুঁজে বের করার সংকল্প করেন।

পাটনার পথে

শ্যালকের কাছ থেকে পনেরো হাজার টাকা ধার নিয়ে চলতি বছরের ১৪ মে জামাল বিন মূসা ভারতে যাত্রা করেন। হাসি বেগমদের ভারতের খোঁজখবর জানেন এমন কয়েকজনের কাছ থেকে জানতে পারেন সাত বোনের বিচরণ মূলত দিল্লি, বিহার ও বেঙ্গালুরে। এর মধ্যে বিহারের পাটনায় এদের নামে বেশ কয়েকটি মামলা আছে। তাই স্থির করেন প্রথমে পাটনা যাবেন। মামলার সূত্র ধরলে সহজেই পাওয়া যাবে সব খবর। সে হিসেবে প্রথমে পাটনা যান। সেখানে পাঁচ-ছয়টি থানায় খোঁজ নেন। কিন্তু সন্ধান পাননি কারো। রহিমা বেগমদের খোঁজ নেওয়া বাদ দেন জামাল। সনুর বাবা-মার ঠিকানা খুঁজে বের করাই তার প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়। পাটনা থেকে তিনি রওনা দেন দিল্লির উদ্দেশে।

দিল্লিতে সনুর বাবা-মাসাক্ষাৎ

সনুর মুখে পাওয়া তার দিল্লির ঠিকানা মাত্র পাঁচটি শব্দ- ‘নয়াদিল্লি, দিলশাদ গার্ডেন, গাড়ির গ্যারেজ’। জামাল দিলশাদ গার্ডেন এলাকায় পৌঁছলেন ১৬ মে দুপুরের দিকে।

অজানা শহর, পকেটে টাকার টান, পেটে ক্ষুধা। দিল্লির পথে হাঁটার সময় অপরিচিত মানুষগুলোর চেহারা যেন আরও দুঃসহ মনে হচ্ছিল। এই এলাকায় একসঙ্গে দেড় শ’ গ্যারেজ। কোন গ্যারেজে পাবেন তিনি সনুর বাবার খবর! তাই সঙ্গে থাকা সনুর ছবি এক গ্যারেজ থেকে আরেক গ্যারেজের মিস্ত্রিদের দেখাতে থাকেন জামাল।

এমন সময় সনুর ছবিতে আটকে গেল একজনের চোখ। ‘ইয়ে মেহবুবক্যা ল্যাড়কা’ চমকে উঠে বললেন ওই ব্যক্তি। চমকে উঠলেন জামাল। তার কাছে সনুর বর্ণনা দিলেন তিনি। জানতে চাইলেন সনুর বাবার খোঁজ। খোঁজ মিললেও দেখা পাওয়া গেল না সনুর বাবার। এদিন অন্য গ্যারেজে কাজ করতে গেছেন মেহবুব। আরেক গাড়ির মিস্ত্রি জামালকে নিয়ে গেলেন মেহবুবের কাছে।

ছয় বছর বয়সে হারিয়ে যাওয়া সনুর কিশোর বয়সী ছবি দেখে চোখ ঝিলিক দিয়ে উঠল মেহবুবের। সব কাজ ফেলে জামালকে জড়িয়ে ধরলেন। অঝোরে কাঁদলেন মেহবুব, কাঁদলেন জামাল। জামালের কাছ থেকে ছেলের সব খবর নিলেন মেহবুব। তাকে নিয়ে গেলেন বাসায়। প্রায় অর্ধযুগ আগে হারানো নাড়িছেঁড়া ধনের খবর নিয়ে আসা জামালকে কীভাবে আপ্যায়ন করবেন তারই যেন দিশা পাচ্ছিলেন না সনুর মা মাধুরী। শুধু বললেন, ‘আজই আমার কলিজাকে দেখতে চাই। বাংলাদেশে যাব। যা যা করার তাই করব। আমার রক্ত পরীক্ষা করলে এখনই রক্ত নিক। সরকার আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দিক।’

হাসি ও রহিমার প্রতারণা

দিল্লিতে বসবাসকারী সনুর মা জামাল বিন মূসাকে জানান, ‘রহিমারা পাশেই থাকত। ছয় বছর আগের কথা। একদিন আমাদের খালি একটি রুমে থাকতে চাইল দুই বোন রহিমা আর হাসি। আমরা তাদের থাকার সুযোগ দিই। এর কিছুদিন পরই সনু হারিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুজি করি। হাসি বেগম ও তার বোন রহিমা একদিন বলল টাকা খরচ করলে বাচ্চাকে পাওয়া যাবে। তবে এ কথা কাউকে জানানো যাবে না। তাদের কখা শুনে গয়না বন্ধক রেখে ইন্ডিয়ান এক লাখ রুপি (প্রথমে ৮০ হাজার, পরে ২০ হাজার) রহিমাদের কাছে দিই। এরপর থেকে আর তাদের কোনো খোঁজ পাইনি। টাকা গেছে গেছে, ছেলেকে যদি পাই তবে জানটা ফিরে পাই। আমরা তো মরেই গেছিলাম। আজ কত বছর ধরে সনুকে খুঁজছি। আপতো ভগবান হে’―এভাবে সনুর মায়ের অনুভূতির কথা জানালেন জামাল ইবনে মূসা।

সুষমা স্বরাজের সঙ্গে সাক্ষাৎ

নয়াদিল্লিতে সনুর পরিবারকে পাওয়ার পর ২০১০ সালে হারিয়ে যাওয়া সনুর বিষয়টি নিশ্চিত হতে স্থানীয় পুলিশের কাছে যান জামাল ইবনে মূসা। থানায় ২০১০ সালের ২৪ মে অভিরূপ সনু হারিয়ে যাওয়ার জিডি (সাধারণ ডায়রি) পান। একই সঙ্গে সংগ্রহ করেন সেই সময়ে পত্রিকায় ছাপানো হারানো বিজ্ঞপ্তি।

এসব তথ্য-প্রমাণ পেয়ে নিশ্চিত হওয়ার পর যান সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। পাঁচ মিনিটের সাক্ষাৎ দেওয়ার আশ্বাস পাওয়া জামাল ইবনে মূসা ও সনুর পরিবারকে এক ঘণ্টা সময় দেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ।

জামাল জানান, সনুকে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া এরই মধ্যে শুরু করেছে ভারত। ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশন থেকে দেশটির কর্মকর্তারা যশোর কিশোর সংশোধনী কেন্দ্রে সনুর সঙ্গে দেখা করে এসেছেন। সুষমা স্বরাজ নিজেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে টুইট করে সনুর বিষয়ে তার সরকারের উদ্যোগের বিষয়টি জানিয়েছেন।

কারা এই হাসি-রহিমা?

হাসি, আকলিমা ও রহিমা বেগমদের বিষয়ে বাংলাদেশের বরগুনা জেলার বেতাগী উপজেলার গ্রামবর্ধন গ্রামে বিভিন্ন ধরনের কথা প্রচলিত আছে। এরা সাত বোন। সব বোন অনেক আগে থেকেই চোরাইপথে ভারতে যাওয়া-আসা করেন বলে অভিযোগ আছে।

জামাল জানান, বাসা-বাড়ির কাজ খুব সুন্দরভাবে করতে পারে বলে সুনাম আছে তাদের। কর্মজীবীদের বাসায় কাজ করে শিশু চুরি করে নিয়ে আসে বলে আমি শুনেছি। আমাদের এলাকার আরও কিছু লোককে ওরা ভারতে নিয়েছিল, তাদের কাছ থেকে এসব জেনেছি আমি।

হাসি বেগমের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলে জানা যায় তিনি এখন বাংলাদেশে নেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় বেতাগী উপজেলা চেয়ারম্যান শাহজাহান কবীর দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ওই এলাকা থেকে ওদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আসে। কিন্তু তাদের সঙ্গে কেউ পেরে ওঠে না। সমাজের গণ্যমান্য লোকদের বিভিন্ন মামলার মাধ্যমে নাজেহাল করে বলে অভিযোগ আছে।

এমনকি ‘ওই বোনদের কার স্বামী কে বা আদৌ স্বামী আছে কি না তাও জানা যায় না,’ জানান উপজেলা চেয়ারম্যান।

এই ঘটনা সম্পর্কে জানতে চাইলে বেতাগী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম দ্য রিপোর্টকে বলেন, আদালতে বিষয়টি বিচারাধীন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।

এ-সংক্রান্ত একটি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও বেতাগী থানার উপপরিদর্শক জহিরুল ইসলাম জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এই বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল, আমরা প্রতিবেদন পাঠিয়েছি।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া উইংয়ে খবর নিয়ে জানা গেছে, সনুকে নিজ দেশের নাগরিক হিসেবে শনাক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে ভারত। এ জন্য ভারতীয় হাইকমিশন তথ্য প্রমাণ জোগাড় করছে। তাদের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সহযোগিতা করবে।

সবশেষ খবর

দ্য রিপোর্টের যশোর প্রতিনিধি খন্দকার দানিয়েল হাবীব বুধবার (১ জুন) জানান একটি চিঠি সনুর দিল্লিতে ফেরার অপেক্ষা যেন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ভারতীয় হাইকমিশনের মাধ্যমে পাওয়া চিঠিতে জানা গেছে, অর্থাভাবে দিল্লিওয়ালা সনুর বাবা-মা বাংলাদেশে আসতে পারছেন না। ফলে বাবা-মার সাথে সন্তানের অর্ধযুগ পরে দেখার ক্ষণটা যেন আরেকটি দীর্ঘই হলো।

যশোর কিশোর সংশোধনী কেন্দ্রে নিরাপদ হেফাজতে থাকা সনুর বাড়ি ফেরা এখন নির্ভর করছে আদালতের নির্দেশনার ওপর। এমন তথ্য জানালেন কেন্দ্রের সাইকো-সোশ্যাল কাউন্সিলর মো. মুশফিকুর রহমান।

তিনি দ্য রিপোর্ট টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অ্যাসিসট্যান্ট সেক্রেটারি (এফ এ-১) এ কে এম মহিউদ্দীন কায়েস স্বাক্ষরিত ভারতীয় হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি রমাকান্ত গুপ্তর একটি চিঠির ফরোয়ার্ড কপি যশোর কিশোর সংশোধনী কেন্দ্রে এসেছে।

তাতে ভারতীয় হাইকমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সনুর বাবা-মার এমন অর্থনৈতিক সচ্ছলতা নেই যে তারা বাংলাদেশে আসবে।

এখন করণীয় কী―এ প্রশ্নের জবাবে কেন্দ্রের সাইকো-সোশ্যাল কাউন্সিলর বলেন, যেহেতু বরগুনার একটি আদালতের নির্দেশে সনুকে এ কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। এখন বিষয়টি আদালতই নির্ধারণ করবে যে সনুকে ভারতীয় হাইকমিশনের হেফাজতে দেবে না কী করবে।

তিনি আরও বলেন, চিঠি পাওয়ার পরপর বুধবারই কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক মো. শাহবুদ্দীন চিঠিটির অনুলিপি বরগুনার বিচারিক আদালতে ডাকযোগে পাঠিয়ে দিয়েছেন।

প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন দ্য রিপোর্টের বরগুনা প্রতিনিধি মুশফিক আরিফ এবং যশোর প্রতিনিধি খন্দকার দানিয়েল হাবীব।

ছবি : আমীর সোয়েব ও সংগৃহীত

(দ্য রিপোর্ট/বিকে/এপি/এএসটি/এম/জুন ০১, ২০১৬)

পাঠকের মতামত:

SMS Alert
Symphony

বিশেষ সংবাদ এর সর্বশেষ খবর

বিশেষ সংবাদ - এর সব খবর



রে