পাভেল রহমান, দ্য রিপোর্ট : বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে উল্লেখযোগ্য নাম হুমায়ূন আহমেদ। ঢাকাই চলচ্চিত্রের প্রথাগত মূলধারা ও বিকল্পধারার সিনেমার বাইরে বেশকিছু সিনেমা পরিচালনা করে কুড়িয়েছেন দর্শক-সমালোচকদের প্রশংসা। এ ছাড়া এ ঔপন্যাসিকের কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত হয়েছে আরও কিছু জনপ্রিয় সিনেমা।

হুমায়ূন ১৯৯৪ সালে নির্মাণ করেন ‘আগুনের পরশমনি’। এর পর আরও ৭টি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন তিনি। রবিবার (১৯ জুলাই) হুমায়ূনের মৃত্যুবার্ষিকী। তাকে স্মরণ করে ঈদের ছুটিতে সিনেমাগুলো দেখে ফেলতে পারেন—

আগুনের পরশমনি

সরকারি অনুদানে নির্মিত ‘আগুনের পরশমনি’ মুক্তি পায় ১৯৯৫ সালে। মুক্তিযুদ্ধকালে অবরুদ্ধ ঢাকায় মুক্তিবাহিনীর অভিযান আর মধ্যবিত্ত একটি পরিবারের সংকট সিনেমাটিতে তুলে ধরা হয়। এতে অভিনয় করেছেন আবুল হায়াত, আসাদুজ্জামান নূর, বিপাশা হায়াত, ডলি জহুর, শিলা আহমেদ ও হোসনে আরা পুতুল। ‘আগুনের পরশমনি’ ৮টি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে— শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র (প্রযোজক হুমায়ূন আহমেদ), শ্রেষ্ঠ কাহিনীকার (হুমায়ূন আহমেদ), শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতা (হুমায়ূন আহমেদ), শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী (বিপাশা হায়াত), শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক (সত্য সাহা), শ্রেষ্ঠ শব্দগ্রাহক (মফিজুল হক), শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী (শিলা আহমেদ), শিশুশিল্পী শাখায় বিশেষ পুরস্কার (হোসনে আরা পুতুল)।

শ্রাবণ মেঘের দিন

১৯৯৯ সালে নির্মিত এ সিনেমাকে অনেকেই হুমায়ূন আহমেদের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে চিহ্নিত করেন। বাংলাদেশের ভাটি অঞ্চলের কাহিনী ও সঙ্গীতপ্রধান এ সিনেমায় অভিনয় করেন জাহিদ হাসান, মাহফুজ আহমেদ, মেহের আফরোজ শাওন, মুক্তি, গোলাম মুস্তাফা, আনোয়ারা, শামীমা নাজনীন, সালেহ আহমেদ ও ডা. এজাজুল ইসলাম। ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ এ ব্যবহৃত লোকজ ও হুমায়ূন আহমেদের লেখা গানগুলো বেশ জনপ্রিয়তা পায়। সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন মকসুদ জামিল মিন্টু। ৭টি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’— শ্রেষ্ঠ অভিনেতা (জাহিদ হাসান), শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতা (গোলাম মুস্তাফা), শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক (মকসুদ জামিল মিন্টু), শ্রেষ্ঠ গীতিকার (রশীদউদ্দিন), শ্রেষ্ঠ গায়ক (সুবীর নন্দী), শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক (মাহফুজুর রহমান খান) ও শ্রেষ্ঠ শব্দগ্রাহক (মফিজুল হক)।

দুই দুয়ারী

ম্যাজিক রিয়েলিজমের গল্প নিয়ে নির্মিত সিনেমাটি মুক্তি পায় ২০০০ সালে। এতে তুলে ধরা হয়েছে একজন রহস্য মানবের কিছু রহস্যময় ঘটনা, যিনি আশ্চর্য উপায়ে মানুষের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করে থাকেন। বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন রিয়াজ, মেহের আফরোজ শাওন, মাহফুজ আহমেদ, ডা. এজাজুল ইসলাম ও মাসুদ আলী খান। ‘দুই দুয়ারী’ দুটি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে— শ্রেষ্ঠ অভিনেতা (রিয়াজ) ও শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক (মাহফুজুর রহমান খান)।

চন্দ্রকথা

২০০৩ সালে মুক্তি পায় ‘চন্দ্রকথা’। পুরনো দিনের জমিদারদের কঠোর মনোভাব, বিলাসিতা ও শিল্পকর্মের প্রতি গভীর অনুরাগ ছবিটিতে তুলে ধরা হয়। হুমায়ূন আহমেদ একইসঙ্গে তুলে ধরেন মানবতা ও নিষ্ঠুরতা। অভিনয় করেন ফেরদৌস, শাওন, চম্পা, আসাদুজ্জামান নূর, আহমেদ রুবেল, স্বাধীন খসরু ও ডা. এজাজুল ইসলাম।

শ্যামল ছায়া

২০০৫ সালে মুক্তি পাওয়া ‘শ্যামল ছায়া’য় হুমায়ূন মুক্তিযুদ্ধকে ভিন্ন আঙ্গিকে তুলে ধরেন। একাত্তরে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পুরো জাতির মধ্যে যে দেশপ্রেম আর একতা তৈরি হয়েছিল তাই এ সিনেমার প্রধান প্রতিপাদ্য। অভিনয় করেছেন রিয়াজ, শাওন, হুমায়ূন ফরীদি, তানিয়া আহমেদ, চ্যালেঞ্জার ও ডা. এজাজুল ইসলাম। অস্কারে বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে এটি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে।

নয় নম্বর বিপদ সংকেত

‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’কে হুমায়ূন অর্থহীন ছবি বলে উল্লেখ করেছেন। একজন ধনাঢ্য বয়স্ক ব্যক্তি হঠাৎ করে তার আপনজনদের কাছে পেতে চান। তাদের এক করতে মিথ্যা মৃত্যুসংবাদ প্রচার করেন তিনি। ঘটতে থাকে মজার মজার ঘটনা। অভিনয় করেছেন রহমত আলী, তানিয়া আহমেদ, রুপক, মিঠু, ডা. এজাজুল ইসলাম ও ফারুক আহমেদ।

আমার আছে জল

সিলেটের মনোরম লোকেশনে চিত্রায়িত এ সিনেমায় একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তার অবকাশযাপন ও ত্রিভুজ প্রেমের গল্প তুলে ধরা হয়। অভিনয় করেছেন বিদ্যা সিনহা মিম, ফেরদৌস, জাহিদ হাসান, শাওন, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, সালেহ আহমেদ, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, মুনমুন আহমেদ, এজাজুল ইসলাম, মুনিরা মিঠু, মাজনুন মিজান, পুতুল, রুদ্র ও ওয়াফা। ২০০৮ সালে ‘আমার আছে জল’ দুটি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে— শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক (মাহফুজুর রহমান খান) ও শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী (মৃধা ইবশার নাওয়ার ওয়াফা)।

ঘেটুপুত্র কমলা

হুমায়ূন আহমেদ নির্মিত সর্বশেষ ছবি ‘ঘেটুপুত্র কমলা’। ৫০ বছর আগের সুনামগঞ্জের ভাটি অঞ্চলের জুলসুকা গ্রাম সিনেমাটির পটভূমি। সে সময় ভাটি অঞ্চলের অভিজাত লোকেরা বালকদের নারী সাজিয়ে নাচ-গানের মাধ্যমে বিলাসিতা করত। বিনোদনের খোরাক এই সব ঘেটুপুত্রের জীবন বঞ্চনার গল্প নিয়েই ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ নির্মিত হয়। নাম ভূমিকায় অভিনয় করেছেন মামুন। আরও অভিনয় করেছেন তারিক আনাম খান, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়, তমালিকা কর্মকার, প্রাণ রায়, কুদ্দুস বয়াতি, প্রান্তি, জুয়েল রানা ও শামীমা নাজনীন। ‘ঘেটুপুত্র কমলা’ ৮টি বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০১২ লাভ করে— শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার (হুমায়ূন আহমেদ), শ্রেষ্ঠ কাহিনী (হুমায়ূন আহমেদ), শ্রেষ্ঠ অঙ্গসজ্জা (এসএম মাঈনুদ্দিন ফুয়াদ), শ্রেষ্ঠ সম্পাদক (ছলিম উল্লাহ ছলি), শ্রেষ্ঠ রূপসজ্জা (খলিলুর রহমান), শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক (ইমন সাহা) ও শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক (মাহফুজুর রহমান খান)। অস্কারে বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে এটি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে।

(দ্য রিপোর্ট/পিএস/ডব্লিউএস/এনআই/জুলাই ১৯, ২০১৫)